সম্প্রতি রাজ্য রাজনীতি ও বিনোদন জগতের একটি বড় খবর হলো বিজেপি নেতা তথা চলচ্চিত্র পরিচালক শঙ্কুদেব পণ্ডা ও বিশিষ্ট সাংবাদিক স্বর্ণালী সরকার-এর বিবাহ। ২০২৬ সালের ১২ই জুলাই কলকাতার গঙ্গার বুকে ভাসমান বিলাসবহুল ‘পোলো ফ্লোটেল’-এ বসেছিল তাঁদের বিয়ের আসর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সহ দলের একাধিক নেতা। এই জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের গুঞ্জনের অবসান ঘটে।
স্বর্ণালী সরকারের মাতৃত্ব ও IVF-এর ভূমিকা
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—স্বর্ণালী সরকারের আগে থেকেই দুটি কন্যা সন্তান থাকা সত্ত্বেও কেন পুনরায় বিবাহ করলেন শঙ্কুদেব? এর উত্তর লুকিয়ে আছে IVF বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন পদ্ধতিতে। স্বর্ণালী সরকারের যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম হয়েছে IVF প্রযুক্তির মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম নেওয়ার পরও মায়ের বৈবাহিক অবস্থা বা সঙ্গীর উপস্থিতি পৃথক বিষয়। গর্ভধারণ ও বিবাহ—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্ত।
IVF পদ্ধতি: কী ও কীভাবে কাজ করে?
IVF বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন হলো একটি সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি, যেখানে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে শরীরের বাইরে একটি পরীক্ষাগারে নিষিক্ত করা হয়। ভারতের বিবাহিত দম্পতিদের ১০% থেকে ১৫% বন্ধ্যাত্বের শিকার বলে জানা গেছে এবং তাদের জন্য IVF-এর মতো প্রযুক্তি বাবা-মা হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
IVF চিকিৎসার মূল ধাপসমূহ:
ডিম্বাশয় উদ্দীপনা: হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করা হয় যাতে একাধিক ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের ফলিকলের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ডিম্বাণু সংগ্রহ: পরিপক্ব ডিম্বাণুগুলো আল্ট্রাসাউন্ড-নির্দেশিত একটি পাতলা সুই ব্যবহার করে ডিম্বাশয় থেকে সংগ্রহ করা হয়।
শুক্রাণু সংগ্রহ ও নিষিক্তকরণ: পুরুষ সঙ্গী বা দাতার শুক্রাণু সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর পরীক্ষাগারে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু একত্রিত করে নিষিক্ত করা হয়। প্রয়োজনে ICSI (ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন) পদ্ধতিতে সরাসরি একটি শুক্রাণুকে ডিম্বাণুতে প্রবেশ করানো হয়।
ভ্রূণ স্থানান্তর: ৩-৫ দিন পর সুস্থ ভ্রূণ(গুলি) একটি পাতলা ক্যাথেটারের মাধ্যমে জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
IVF-এর সুবিধা ও প্রয়োগ:
- বন্ধ্যাত্বের সমাধান: যেসব দম্পতি স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণে সমস্যার সম্মুখীন হন, তাদের জন্য এটি কার্যকর।
- জিনগত সমস্যা সমাধান: প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক টেস্টিংয়ের (PGT) মাধ্যমে জিনগত রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
- সকলের জন্য সুযোগ: সমকামী দম্পতি এবং একক অভিভাবকসহ সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষ এই পদ্ধতির সুবিধা পেতে পারেন।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সতর্কতা:
যেকোনো চিকিৎসা পদ্ধতির মতো IVF-এরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে:
- একাধিক গর্ভধারণ: IVF-তে একাধিক ভ্রূণ স্থানান্তরের ফলে যমজ বা তার বেশি সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
- ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম (OHSS): ডিম্বাশয় উর্বরতার ওষুধের প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখালে এটি হতে পারে।
- একটোপিক গর্ভাবস্থা: ভ্রূণ জরায়ুর বাইরে, সাধারণত ফ্যালোপিয়ান টিউবে রোপন করলে তা ঘটে।
- মানসিক চাপ: পুরো প্রক্রিয়াটি মানসিকভাবে কঠিন হতে পারে।
IVF-এর খরচ:
ভারতে IVF চিকিৎসার খরচ বিভিন্ন শহরে ভিন্ন:
- কলকাতা: আনুমানিক ₹১,০০,০০০ – ₹২,৫০,০০০
- অন্যান্য মেট্রো শহরে খরচ ভিন্ন হতে পারে
স্বর্ণালী-শঙ্কুদেব: কীভাবে এগোলো সম্পর্ক?
দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের সম্পর্কের ফিসফাস রাজনৈতিক ও সংবাদ মহলে শোনা যেত, তবে প্রকাশ্যে প্রশ্ন করলে দুজনেই তা এড়িয়ে যেতেন। শঙ্কুদেব যখন ছাত্রনেতা, তখন থেকেই স্বর্ণালীর সঙ্গে তাঁর আলাপ। ২০২২ সালে আংটি বদল করলেও পরে বিবাহ থেকে সরে আসেন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে স্বর্ণালী সিদ্ধান্ত নেন IVF-এর মাধ্যমে মা হবেন—এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন শঙ্কুদেব।
কন্যাসন্তানদের অন্নপ্রাশনে বাবা হিসেবে পুজোয় বসেছিলেন শঙ্কুদেব—এই ঘটনা থেকেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১২ই জুলাই ২০২৬-এ তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
উপসংহার
IVF আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিস্ময়, যা অনেক বন্ধ্যা দম্পতি ও ব্যক্তিকে সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করে। স্বর্ণালী সরকারের দুটি কন্যা IVF পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়ার কারণে তারা শঙ্কুদেবের সন্তান নন—এটি একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এই কারণেই স্বর্ণালীর সন্তান থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিবাহ সামাজিক ও আইনগতভাবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। স্বর্ণালী ও শঙ্কুদেবের সম্পর্কের গল্প শুধু প্রেমের নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকার উদাহরণ। IVF প্রযুক্তি স্বর্ণালীকে মাতৃত্ব দিয়েছে, আর সেই সন্তানদের প্রতি শঙ্কুদেবের দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসাই সম্ভবত তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।



















