ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনা দেশের লক্ষাধিক কারিগর ও শিল্পীদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি যুগান্তকারী প্রকল্প। ২০২৩ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্মা জয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। ২০২৬ সালে এই প্রকল্পটি এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলিতে এর প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা এই প্রকল্পের এ টু জেড বিস্তারিত আলোচনা করব।
বিশ্বকর্মা যোজনা কী?
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনা একটি কেন্দ্রীয় সেক্টর প্রকল্প, যা হাত ও সরঞ্জাম দিয়ে কাজ করা ঐতিহ্যবাহী কারিগর ও শিল্পীদের (বিশ্বকর্মা) জন্য চালু করা হয়েছে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প মন্ত্রক (MSME) এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির মেয়াদ পাঁচ বছর (২০২৩-২৪ থেকে ২০২৭-২৮) এবং এজন্য ১৩,০০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান এবং তাদের পণ্য বিক্রির জন্য বাজার সংযোগ তৈরি করা। ফলস্বরূপ, তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। ইতিমধ্যে ২.৫৮ কোটি আবেদন জমা পড়েছে এবং ২৩.৭ লক্ষ কারিগর নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন? (যোগ্যতা)
এই প্রকল্পের আওতায় আসতে আবেদনকারীকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে:
- পেশা: আবেদনকারীকে ১৮টি নির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী পেশার (যেমন: ছুতোর, কামার, কুমোর, স্বর্ণকার, রাজমিস্ত্রি, দর্জি, মুচি, নাপিত ইত্যাদি) সঙ্গে যুক্ত হতে হবে এবং হাতের কাজে দক্ষ হতে হবে।
- বয়স: আবেদনের সময় বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে।
- পারিবারিক শর্ত: একটি পরিবার থেকে শুধুমাত্র একজন সদস্য এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারবেন।
- অন্যান্য ঋণ: আবেদনকারী গত ৫ বছরের মধ্যে PMEGP, PM SVANidhi, বা মুদ্রার মতো অন্যান্য সরকারি স্বনির্ভর প্রকল্পের অধীনে ঋণ নিয়ে থাকলে তিনি অযোগ্য হবেন।
- নাগরিকত্ব: আবেদনকারীকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।
১৮টি পেশার তালিকা
এই প্রকল্পে নিচের ১৮টি পেশার কারিগররা আবেদন করতে পারেন:
১. ছুতোর, ২. নৌকা নির্মাতা, ৩. স্বর্ণকার, ৪. রাজমিস্ত্রি, ৫. অস্ত্র নির্মাতা, ৬. হাতুড়ি ও সরঞ্জাম নির্মাতা, ৭. ভাস্কর, ৮. কামার, ৯. তালা নির্মাতা, ১০. মুচি (জুতো শিল্পী), ১১. কুমোর, ১২. ঝুড়ি/মাদুর/ঝাড়ু নির্মাতা, ১৩. নাপিত, ১৪. মালাকার (মালা তৈরি), ১৫. পুতুল ও খেলনা নির্মাতা, ১৬. দর্জি, ১৭. ধোপা এবং ১৮. জাল নির্মাতা।
বিশ্বকর্মা যোজনার সুবিধা কী কী?
এই প্রকল্পের অধীনে কারিগররা পাঁচটি প্রধান ধরনের সহায়তা পান:
১. স্বীকৃতি ও পরিচয়পত্র: নিবন্ধিত কারিগররা একটি বিশ্বকর্মা সার্টিফিকেট এবং আইডি কার্ড পান। এর মাধ্যমে তারা সরকারি স্বীকৃতি পান।
২. দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও ভাতা: প্রশিক্ষণের দুটি ধাপ রয়েছে:
- মৌলিক প্রশিক্ষণ: ৫-৭ দিন (৪০ ঘণ্টা)।
- উন্নত প্রশিক্ষণ: ১৫ দিন (১২০ ঘণ্টা)।
- প্রতিদিনের প্রশিক্ষণের জন্য ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়।
৩. টুলকিট সহায়তা: প্রশিক্ষণ শেষে আধুনিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ১৫,০০০ টাকার ই-রুপি ভাউচার দেওয়া হয়। এই টাকা ফেরত দিতে হয় না।
৪. ঋণ সহায়তা (সুদ) : জামানত ছাড়াই দুই কিস্তিতে মোট ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়:
- প্রথম কিস্তি: ১ লক্ষ টাকা (১৮ মাসের পরিশোধ সময়কাল)।
- দ্বিতীয় কিস্তি: ২ লক্ষ টাকা (প্রথম কিস্তি সঠিকভাবে পরিশোধ করলে) (৩০ মাসের পরিশোধ সময়কাল)।
- সুদের হার: মাত্র ৫% বার্ষিক। বাকি সুদের ভার (৮% পর্যন্ত) সরকার বহন করে।
৫. ডিজিটাল লেনদেনের প্রণোদনা: প্রতি ডিজিটাল লেনদেনে ১ টাকা (মাসে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা) প্রণোদনা দেওয়া হয়।
৬. বিপণন সহায়তা: জাতীয় বিপণন কমিটি (NCM) মান প্রত্যয়ন, ই-কমার্স লিংক, ব্র্যান্ডিং এবং ট্রেড ফেয়ারে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।
কীভাবে আবেদন করবেন? (ধাপে ধাপে)
আবেদন প্রক্রিয়াটি বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC)-এ গিয়ে সম্পন্ন করতে হয়:
১. আপনার নিকটস্থ কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC)-এ যান এবং আপনার আধার কার্ড ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর নিয়ে যান।
২. CSC অপারেটর আপনার আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) দিয়ে নিবন্ধন করবেন।
৩. আপনার তথ্য যাচাইয়ের জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত বা পুরসভায় পাঠানো হবে।
৪. জেলা বাস্তবায়ন কমিটি (DIC) আপনার আবেদন পর্যালোচনা করবে।
৫. অনুমোদন পেলে আপনি বিশ্বকর্মা সার্টিফিকেট ও আইডি কার্ড পাবেন।
৬. তারপর প্রশিক্ষণ শেষ করে ১৫,০০০ টাকার ই-রুপি ভাউচার দাবি করতে পারবেন।
৭. প্রয়োজনে প্রথম কিস্তির ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
আপনি অনলাইন পোর্টাল pmvishwakarma.gov.in-এ গিয়ে আবেদনের স্ট্যাটাস চেক করতে পারেন। এছাড়াও হেল্পলাইন নম্বর: 1800-267-7777-এ কল করেও সাহায্য নিতে পারবেন।
সতর্কতা
- আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগীকে টাকা দেবেন না।
- কেবল অফিসিয়াল পোর্টাল pmvishwakarma.gov.in এবং CSC-এর মাধ্যমেই আবেদন করুন।
বিশ্বকর্মা যোজনা পশ্চিমবঙ্গে
পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজি হয়েছে এবং রাজ্য ও জেলা স্তরে কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাজ্যে বর্তমানে ৭.৭৯ লক্ষ কারিগর এই প্রকল্পে নিবন্ধিত রয়েছেন। বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প যেমন তাঁত, মৃৎশিল্প, কাঁসাশিল্প ইত্যাদি এই প্রকল্পের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উপসংহার
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনা ভারতের অগণিত কারিগর ও শিল্পীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এটি তাদের আর্থিক সুরক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি অনন্য সুযোগ। সঠিক তথ্য ও নির্ভীক চিত্তে আবেদন করলে যেকোনো যোগ্য কারিগর এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন এবং আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারেন।




















