২০২৬ সালের জুন মাস পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাজ্য অবশেষে আয়ুষ্মান ভারত কার্ড প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। ৮ই জুন জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ (NHA)-এর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ দেশের ৩৬তম রাজ্য হিসেবে এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে আয়ুষ্মান ভারত কার্ড এখন সারা দেশে সম্পূর্ণরূপে কার্যকরী হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে “সুস্থ বাংলা, সুস্থ ভারত” লক্ষ্যের দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইতিমধ্যেই রাজ্যের একাধিক জেলায় এই যোজনার ফর্ম পূরণের কাজ শুরু হয়ে গেছে। পুরসভা স্তরে আশা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর ফর্ম বিতরণ করছেন এবং আবেদনকারীদের তথ্য সংগ্রহ করছেন। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব কীভাবে এই ফর্ম পূরণ করতে হয়, কী কী নথি প্রয়োজন এবং এই আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর সুবিধাগুলো কী কী।
আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের সুবিধা: কেন এই কার্ড জরুরি?
আয়ুষ্মান ভারত কার্ড মূলত একটি স্বাস্থ্যবীমা কার্ড। এর অধীনে প্রতি পরিবারকে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হয়। এই টাকায় সরকারি ও তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি, জটিল সার্জারি, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা—সব খরচই কভার হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রকল্পে পরিবারের সদস্য সংখ্যা, বয়স বা লিঙ্গের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর গুরুত্ব অপরিসীম। রাজ্যের প্রায় ১.৪৩ কোটি পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১.২৪ কোটি SECC ২০১১-এর তালিকাভুক্ত পরিবার, প্রায় ৩.০৩ লক্ষ আশা, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকার পরিবার এবং প্রায় ১৫.৯৫ লক্ষ ৭০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিকের পরিবার। বিশেষ করে ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক, আয় নির্বিশেষে, আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর জন্য যোগ্য।
আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের ফর্ম ফিলআপ: কীভাবে পূরণ করবেন?
বর্তমানে রাজ্যে যে আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর ফর্ম বিতরণ করা হচ্ছে, তা অনেকটাই আগে থেকে পূরণ করা অবস্থায় আসছে। ফর্মটিতে আবেদনকারীর নাম, মোবাইল নম্বর, আংশিক আধার নম্বর, রেশন কার্ড নম্বর, জেলা, ব্লক বা পুরসভা এবং গ্রাম পঞ্চায়েত বা ওয়ার্ডের তথ্য আগে থেকেই ছাপানো থাকে। ফলে আবেদনকারীদের এই অংশগুলো পূরণ করতে হয় না। তবে নিচের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবেদনকারীদের নিজেদের পূরণ করতে হবে:
১. রেশন কার্ডের ধরণ নির্বাচন: ফর্মে রেশন কার্ডের তিনটি ভাগ উল্লেখ আছে— AAY (অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা), SPHH (রাজ্য পরিবার স্বাস্থ্য হিম) এবং PHH (প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আওয়াস যোজনা)-এর অধীনে। আপনার রেশন কার্ড যে বিভাগের অধীনে পড়ে, সেই অপশনটি নির্বাচন করতে হবে।
২. পারিবারিক তথ্য: এই অংশে পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা লিখতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীর প্যান কার্ড নম্বর, ভোটার কার্ডের EPIC নম্বর এবং ভোটার তালিকার AC নম্বর, পার্ট নম্বর ও ক্রমিক নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
৩. স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের তথ্য: রাজ্যে আগে চালু ছিল স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প। নতুন আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর ফর্মে সেই স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের URN নম্বরও উল্লেখ করতে হবে।
আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের জন্য কী কী নথি প্রয়োজন?
আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর ফর্ম পূরণের পাশাপাশি আবেদনকারীদের নিচের নথিগুলোর জেরক্স (সত্যায়িত কপি) জমা দিতে হবে:
- আধার কার্ড: পরিচয় প্রমাণের জন্য আবশ্যিক।
- রেশন কার্ড: পরিবারের সদস্যপদ যাচাইয়ের জন্য।
- প্যান কার্ড: আয়কর সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
- স্বাস্থ্যসাথী কার্ড: পূর্ববর্তী প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য।
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি: আবেদনকারীর সাম্প্রতিক রঙিন ছবি।
ফর্মটি পূরণ ও নথি জমা দেওয়ার পর আশা কর্মীদের মাধ্যমে তা নির্দিষ্ট জায়গায় জমা দিতে হবে। সরকারি কর্তৃপক্ষ সমস্ত নথি যাচাই করে আবেদনকারীকে আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
আয়ুষ্মান ভারত কার্ড পাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিপস ও সতর্কতা
- সঠিক তথ্য দিন: আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর ফর্ম পূরণের সময় সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে দিন। ভুল তথ্য দিলে আপনার আবেদন বাতিল হতে পারে বা পরে সমস্যা হতে পারে।
- প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখুন: ফর্ম পূরণের আগে সব প্রয়োজনীয় নথির জেরক্স এবং আসল নথি সঙ্গে রাখুন।
- জালিয়াতি থেকে সাবধান: কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা যদি টাকা নিয়ে আয়ুষ্মান ভারত কার্ড করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে সাবধান হন। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। অফিসিয়াল চ্যানেল ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে আবেদন করবেন না।
- আধার-লিঙ্কড মোবাইল নম্বর: নিশ্চিত করুন যে আপনার মোবাইল নম্বর আধারের সাথে যুক্ত, কারণ আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়ায় OTP-এর প্রয়োজন হতে পারে।
- অনলাইন আবেদনের সুযোগ: শুধু অফলাইন নয়, আপনি অনলাইনেও আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর জন্য আবেদন করতে পারেন beneficiary.nha.gov.in পোর্টালে গিয়ে। সেখানে আপনার মোবাইল নম্বর ও OTP-এর মাধ্যমে লগইন করে সহজেই আবেদন করতে পারবেন।
- সহায়তা নিন: প্রয়োজনে আপনার এলাকার আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাহায্য নিন। ফর্ম পূরণে তারা আপনাকে গাইড করবেন।
- পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি: নিশ্চিত করুন যে ফর্মে আপনার পরিবারের সকল যোগ্য সদস্যের তথ্য সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কারণ আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর সুবিধা পরিবারভিত্তিক।
উপসংহার
আয়ুষ্মান ভারত কার্ড যোজনা পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য এক বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। বছরে ৫ লক্ষ টাকার ক্যাশলেস চিকিৎসা সুবিধা অনেক পরিবারকে চিকিৎসার খরচের বোঝা থেকে রেহাই দেবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ এখন জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়েছে, যা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করবে।
আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি আয়ুষ্মান ভারত কার্ড-এর আওতায় আসেন, তবে দেরি না করে ফর্ম পূরণ করুন এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দিন। এই প্রকল্পটি কেবল একটি স্বাস্থ্যবীমা নয়, এটি একটি সুস্থ ও সুরক্ষিত জীবনের অধিকারের সেতু।
এই নিবন্ধটি ২০২৬ সালের জুলাই মাসের সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। সর্বশেষ আপডেটের জন্য beneficiary.nha.gov.in ওয়েবসাইট দেখুন।




















